মোঃ দেলোয়ার হোসেন, সাতক্ষীরা
মাদকবিরোধী সচেতনতার নামে আয়োজিত ক্রিকেট টুর্নামেন্টই পরিণত হলো দুর্নীতির খোলা মঞ্চে। সাতক্ষীরা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর আয়োজিত ক্রিকেট টুর্নামেন্টে প্রকাশ্য ম্যাচ ফিক্সিং, ফলাফল কেনাবেচা ও খেলোয়াড়দের জিম্মি করে রাখার মতো ভয়ংকর অভিযোগ উঠে এসেছে। পুরো আয়োজনকে ঘিরে এখন প্রশ্ন উঠেছে এটি আদৌ কোনো ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল, নাকি আগে থেকেই লেখা নাটকের মহড়া?
অভিযোগ রয়েছে, আয়োজক সংস্থা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সাতক্ষীরাকে ফাইনালে তুলতেই পুরো টুর্নামেন্টের কাঠামো সাজানো হয়। দেবহাটা উপজেলা একাদশ বনাম মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর একাদশের সেমিফাইনাল ম্যাচে পরিকল্পিতভাবে ম্যাচ ফিক্সিং করে আয়োজক দলকে জোরপূর্বক ফাইনালে তোলা হয়।
একাধিক খেলোয়াড়ের ভাষ্যমতে, টিম ম্যানেজমেন্টের সরাসরি নির্দেশে ফিল্ডিংয়ে ক্যাচ ফেলে দেওয়া, ব্যাট হাতে রান না করা,
বোলিংয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত রান দেওয়া এই নির্দেশ মানতে বাধ্য করা হয়। যারা আপত্তি তুলেছেন, তাদের ভয়ভীতি ও মানসিক চাপে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা ভিত্তিক টুর্নামেন্ট হলেও নিয়মের তোয়াক্কা করা হয়নি। একই কোচ ও টিম ম্যানেজারের হাতে পাঁচটি উপজেলার দল তুলে দেওয়া হয় যা ক্রীড়ানৈতিকতার সরাসরি হত্যাকাণ্ড বলে মন্তব্য করেছেন ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা।
একাধিক খেলোয়াড় অভিযোগ করেন, ক্যাপ্টেন সিদ্দিকুর রহমান সিদ্দীক টিম ম্যানেজমেন্টের নির্দেশে স্পষ্টভাবে জানান “এই ম্যাচ আমাদের হারতেই হবে।” এর পরই মাঠে দেখা যায় অস্বাভাবিক ভুল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত খেলা।
টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া খেলোয়াড় আল আমিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ উগরে দিয়ে লেখেন,
“আজ আমার জীবনের সবচেয়ে কলঙ্কিত টুর্নামেন্ট খেললাম। কর্মকর্তারা সবাই দুর্নীতিবাজ। আজ বুঝলাম সাতক্ষীরায় কেন ক্রিকেট লীগ হয় না। খেলোয়াড়দের কোনো দোষ নেই, দোষ কর্মকর্তাদের। তারা আমাদের দিয়ে ইচ্ছে করে ম্যাচ হারায়। এভাবে চললে এই দেশ থেকে ক্রিকেট একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।”
এই স্ট্যাটাস মুহূর্তেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
‘মাদকমুক্ত’ নয়, দুর্নীতিতে ভরা টুর্নামেন্ট
এ বিষয়ে মন্তব্য করে মুহা. আসাদুজ্জামান নুর বলেন,
“এটা কোনো মাদকমুক্ত টুর্নামেন্ট নয়, এটা দুর্নীতিতে ভরা একটি টুর্নামেন্ট।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক খেলোয়াড় জানান, নিঃসন্দেহে এটি অর্থের বিনিময়ে মীমাংসা করা হয়েছে যেহেতু ফাইনালে উঠলে একটা প্রাইজ মানি পাওয়া যাবে ফ্রিতে কেউ ছেড়ে দিবে না।
ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগে অভিযুক্ত সাতক্ষীরা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান–এর বক্তব্য নিতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাঁকে ফোনে পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট টিম ম্যানেজমেন্টও প্রশ্নের মুখে নিশ্চুপ।
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ জনসাধারণ বলছেন— “সরকারের টাকা লুটপাট করে খেলাধুলার নামে এই প্রহসন কেন? মাদকবিরোধী অভিযানের দায়িত্বে যারা, তারাই যদি দুর্নীতিতে ডুবে থাকে, তাহলে সমাজ কোন পথে যাবে?”
সচেতন মহলের দাবি, এই টুর্নামেন্টের উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত, অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, এবং ভবিষ্যতে সরকারি আয়োজনে ক্রীড়া ইভেন্টে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ক্রীড়াঙ্গনে সাধারণ মানুষের আস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।
এ জাতীয় আরো খবর..