×
সদ্য প্রাপ্ত:
শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে ধানক্ষেত এর পাশ থেকে অজ্ঞাত নারীর মরদেহ উদ্ধার মোন্থা’ এখন প্রবল ঘূর্ণিঝড়, বেড়েছে বাতাসের গতিবেগ না ফেরার দেশে তিনবারের বিশ্বজয়ী হাফেজ ত্বকী অস্ত্র মামলায় সম্রাটের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণ পরিশোধের দাবি সিলেটে দুই ট্রাক সাদাপাথর জব্দ, চালকদের দেড় লাখ টাকা জরিমানা হবিগঞ্জে জামায়াত প্রার্থীর গাড়িতে দুর্বৃত্তদের হামলা ঢাকার ফ্লাইট নামছে চট্টগ্রাম-কলকাতায় মক্কায় এক সপ্তাহে ১৩.৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ দুটি পবিত্র মসজিদ পরিদর্শন করেছেন শিক্ষকদের ‘মার্চ টু সচিবালয়’ শুরু, পুলিশের বাধা
  • প্রকাশিত : ২০২৫-১২-২০
  • ১৩৪ বার পঠিত
ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ 

পরিবার—মানুষের জীবনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ, সংবেদনশীল ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের পরিসর। এখানেই ভালোবাসা, দায়িত্ব, ত্যাগ ও প্রত্যাশার জটিল বন্ধন গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কের কেন্দ্রে যিনি সবচেয়ে বেশি সময়, শ্রম ও আবেগ ব্যয় করেন, তিনি হলেন নারী। যুগ বদলেছে, সমাজ বদলেছে, নারীর শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বেড়েছে; তবু নারীর পারিবারিক জীবনের সফলতা ও ব্যর্থতার মাপকাঠি আজও প্রায় একই রয়ে গেছে। প্রশ্ন হলো—এই সফলতার সংজ্ঞা কে ঠিক করে দেয়? আর ব্যর্থতার দায়ই বা কেন বারবার নারীর কাঁধে এসে পড়ে?

সফলতার সামাজিক সংজ্ঞা

নারীর পারিবারিক জীবনে সফলতা বলতে সমাজ সাধারণত কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়কেই বোঝে—সংসার গুছিয়ে রাখা, স্বামীর মন রক্ষা করা, শ্বশুরবাড়ির সবার সঙ্গে মানিয়ে চলা, সন্তানকে ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলা এবং সর্বোপরি কোনো অভিযোগ ছাড়াই সবকিছু সামলে নেওয়া। এই তালিকায় নারীর নিজের স্বপ্ন, পছন্দ, ক্লান্তি কিংবা মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয় খুব কমই জায়গা পায়।

একজন নারী যদি এসব প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন, তবে তাকে বলা হয় ‘ভালো বউ’, ‘সফল গৃহিণী’ বা ‘আদর্শ নারী’। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে যে নিরবচ্ছিন্ন শ্রম, আত্মত্যাগ ও আত্মসংযম কাজ করে, তার সামাজিক স্বীকৃতি খুবই সীমিত। সফলতার এই সংজ্ঞা মূলত নারীর ভূমিকার একতরফা মূল্যায়ন, যেখানে দায়িত্বের হিসাব আছে, কিন্তু অধিকার ও সমান অংশগ্রহণের স্বীকৃতি নেই।

দায়িত্বের ভারসাম্যহীনতা

পরিবার একটি যৌথ কাঠামো হলেও বাস্তবে এর অধিকাংশ দায়ভার এসে পড়ে নারীর ওপর। সন্তান লালন-পালন, রান্না, ঘর সামলানো, বৃদ্ধ সদস্যদের দেখাশোনা—এসব কাজকে ‘নারীর স্বাভাবিক দায়িত্ব’ বলে ধরে নেওয়া হয়। পুরুষ যদি এসব কাজে সামান্য অংশগ্রহণও করেন, তাহলে সেটিকে ‘সহযোগিতা’ হিসেবে দেখা হয়; কিন্তু নারী এসব দায়িত্বে ব্যর্থ হলে তা হয়ে ওঠে তার ব্যক্তিগত অযোগ্যতা।

এই ভারসাম্যহীনতা নারীর জীবনে এক ধরনের স্থায়ী চাপ তৈরি করে। সংসার ভালো চললে কৃতিত্ব সবার, আর কোথাও সমস্যা দেখা দিলে প্রথম প্রশ্ন ওঠে—নারী ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করতে পারছে কি না।

ব্যর্থতার দায় কেন নারীর?

সংসারে অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, সন্তানদের আচরণগত সমস্যা কিংবা বিবাহবিচ্ছেদ—এসব ক্ষেত্রেই সমাজের প্রথম দৃষ্টিটি পড়ে নারীর দিকে। প্রশ্ন করা হয়, ‘সে কি ঠিকমতো সংসার সামলাতে পেরেছে?’, ‘সে কি স্বামীকে বুঝতে পেরেছে?’, ‘সে কি সন্তানদের যথেষ্ট সময় দিয়েছে?’

পুরুষের দায়িত্ব, আচরণ বা সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম হয়। ফলে ব্যর্থতার দায় একতরফাভাবে নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। এই মানসিকতা নারীর আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং অনেক সময় তাকে নীরব সহিংসতার ভেতর আটকে রাখে।

আত্মত্যাগের মহিমা ও নীরব প্রত্যাশা

আমাদের সমাজে নারীর আত্মত্যাগকে মহিমান্বিত করা হয়। ‘সব সহ্য করা’, ‘নিজেকে ভুলে যাওয়া’, ‘পরিবারের জন্য সব ছেড়ে দেওয়া’—এসবকে নারীর গুণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু এই মহিমার আড়ালে নারীর ব্যক্তিসত্তা ক্রমশ বিলীন হয়ে যায়।

একজন নারী যত বেশি ত্যাগ করেন, সমাজ তত বেশি তার কাছ থেকে নিঃশর্ত দায়িত্ব প্রত্যাশা করে। ক্লান্তি, হতাশা বা ব্যক্তিগত চাহিদার কথা বললে তাকে বলা হয় ‘অভিমানী’ বা ‘অসহিষ্ণু’। ফলে অনেক নারী নিজের কষ্টকে চেপে রেখে ‘সফল সংসার’-এর মুখোশ পরে থাকেন।

পরিবর্তনশীল বাস্তবতা, অপরিবর্তিত মানসিকতা

আজকের নারী শিক্ষা, চাকরি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। তিনি একই সঙ্গে কর্মজীবী, মা, স্ত্রী ও কন্যার ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু পারিবারিক দায়িত্বের পুনর্বণ্টন সেই হারে হয়নি। কর্মক্ষেত্রে আট ঘণ্টা কাজের পরও সংসারের পূর্ণ দায়ভার তার ওপরই বর্তায়।

এই দ্বৈত চাপ নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। তবু সমাজ তার কাছ থেকে একই ‘নিরব সফলতা’ প্রত্যাশা করে। পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে মানসিকতার এই অসামঞ্জস্য নারীর জীবনে গভীর সংকট তৈরি করছে।

সফলতার নতুন সংজ্ঞা প্রয়োজন

নারীর পারিবারিক জীবনের সফলতা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হওয়া জরুরি। সফলতা মানে শুধু নিঃশব্দে সব সহ্য করা নয়; বরং সমান দায়িত্ব, পারস্পরিক সম্মান, সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ এবং ব্যক্তিসত্তার স্বীকৃতি।

একটি পরিবার তখনই সত্যিকার অর্থে সফল, যখন সেখানে নারী ও পুরুষ উভয়ের দায়িত্ব ও অধিকার সমানভাবে বিবেচিত হয়। সন্তানের সঠিক বেড়ে ওঠা, দাম্পত্য সৌহার্দ্য ও পারিবারিক শান্তি—এসবের দায় এককভাবে নারীর নয়, বরং পুরো পরিবারের।

পরিশেষে বলতে চাই, 
নারীর পারিবারিক জীবনের সফলতা ও ব্যর্থতার প্রশ্ন আসলে সমাজের মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। যতদিন আমরা সফলতার একতরফা সংজ্ঞা চাপিয়ে দেব এবং ব্যর্থতার দায় নারীর কাঁধে চাপাব, ততদিন পরিবারে প্রকৃত শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

নারীকে শুধু ত্যাগের প্রতীক নয়, বরং একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখার মধ্যেই পারিবারিক জীবনের সত্যিকারের সফলতা নিহিত। এই উপলব্ধিই পারে পরিবারকে আরও মানবিক, সমতাভিত্তিক ও টেকসই করে তুলতে।

লেখক, কলাম লেখক ও প্রবন্ধকার 
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
lube
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...

Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat