‘ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া’ কথাটি আমার নয়, খোদ সিঙ্গাপুরের দ্রষ্টা-স্রষ্টা নির্মাতা লি কুয়ান ইউর।
সাংবাদিকেরা বা বিদেশিরা মালয়েশিয়া থেকে সিঙ্গাপুরের ‘সিসেশন’ বা ‘সেপারেশন’ বা বিভক্তি হয়েছে বললে তিনি মনে করিয়ে দিতেন—না না না, বিভক্তি হয়নি, আমাদের বের করে দেওয়া হয়েছে (নট সিসিডেড, উই আর এক্সপেলড)। বের করে দেওয়া নিয়ে তাঁর হীনম্মন্যতা ছিল না; বরং সত্য বলাটাই সততা—বিশ্বাস করতেন। ইতিহাস তো ইতিহাসই!
১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়ার সংসদে আইন করে সিঙ্গাপুরকে মালয়েশিয়া থেকে বের করে দেওয়ার পর লি কুয়ান ইউ বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। তাঁর কান্নার বাঁধভাঙা আইকনিক ছবিটি অনেকেই দেখে থাকবেন। (খুঁজলে ছবিটি অনলাইনে এখনো পাওয়া যেতে পারে। টিভি ফুটেজও ইউটিউবে থাকার কথা।) মধ্য ষাটের দশকে মালয়ি-প্রধান মালয়েশিয়ার সঙ্গে সিঙ্গাপুরের অমালয়ি চীনা বংশোদ্ভূতরাসহ সংখ্যালঘু তামিল অধিবাসীদের দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে। সাংস্কৃতিক পরিচিতির কারণে পিছিয়ে পড়া, এবং কেন্দ্রের দ্বারা প্রান্তের শোষিত হওয়া এবং অন্যান্য বৈষম্যের কারণে দ্বন্দ্ব বাড়ছিল। ১৯৬৪ সালে একটি সাংস্কৃতিক দাঙ্গাও হয়েছিল।
তুলনায় নিলে অবাক হওয়ার বিষয়, মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুর দ্বন্দ্ব পরিস্থিতি এবং পশ্চিম পাকিস্তান-পুর্ব পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব পরিস্থিতি প্রায় একই রকম ছিল। দ্বন্দ্বগুলো তেজি হওয়ার ঘটনাও সমসাময়িক (মধ্য ষাট), সিঙ্গাপুরে যেমন মধ্য ষাটে, বাংলাদেশেও। বৈষম্য, বঞ্চনা, কেন্দ্র দ্বারা প্রান্তের শোষণ ও রাজনৈতিক হিস্যায় কমতি ইত্যাদি। মালয়েশিয়া সংসদে আইন করে সিঙ্গাপুরকে আলাদা করে দিল। ভাবসাব, ‘যা বাবা, অত মারামারি, ঝুটঝামেলা, বৈষম্যের অনুযোগ-অভিযোগ নিয়ে একসঙ্গে থাকতে হবে না! যা আলাদা হয়ে যা।’
আলাপটি মোড় ঘুরে অন্যদিকে চলে যাওয়ার আগে লি কুয়ান প্রসঙ্গে ফিরি। লি কুয়ান কেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, তাঁর কাছ থেকে কী শেখার ছিল, আমরা কেন না শিখে ঠিক উল্টো পথেই হাঁটলাম, সেই প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা দরকার।
লি কুয়ান রাষ্ট্রসংস্কারে নামলেন। সংস্কার এলে পুনর্গঠন হবেই। তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বেশ কিছু নীতিমালা করলেন। নীতিমালাগুলোর তিনটির বিষয়ে ন্যূনতম ছাড়ও দেননি। সেই অন্যতম তিনটি নীতিমালা বাংলাদেশ অনায়াসেই অনুসরণ করতে পারত। কারণ, ১৯৭১ সালে বিজয়ের পরপরই দেখার সুযোগ ছিল মাত্র ছয় বছরে সিঙ্গাপুর কোথায় গিয়ে পৌঁছাল, কীভাবে পৌঁছাল! সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের চালকেরা সামান্য ভিশনারিও যদি হতেন, সিঙ্গাপুর থেকে শিখতেন।লি কুয়ানের যুদ্ধ ঘোষণার মতো তিন নীতিমালার একটি বিষয়ে তাঁর উদ্ধৃতি—ইফ ইউ ওয়ান্ট টু বিট করাপশন, বি প্রিপেয়ার্ড টু জেল ইয়োর ফ্রেন্ডস (যদি আপনি দুর্নীতিকে হারাতে চান, তবে নিজের বন্ধুদের জেলে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত থাকুন।) দুর্নীতির বেলায় ‘জিরো টলারেন্স’ তিনি শুধু কথার কথাই রাখেননি। সত্যিকারের প্রয়োগও ঘটিয়েছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠতম বন্ধু, তারই মন্ত্রিপরিষদের ডাকসাইটে মন্ত্রী আত্মগ্লানিতে আত্মহত্যা করেছিলেন। তিনি বন্ধুকে রক্ষায় দাঁড়াননি। কারণ, বন্ধুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ মিলছিল।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালাটি ছিল—যেকোনো মূল্যে নির্বাহী বিভাগকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের চাপ থেকে শতভাগ মুক্ত করে দিয়ে মেধানির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। তিনি দেখালেন, কীভাবে সত্যিকারের মেরিটোক্র্যাসির (মেধাতন্ত্রের)চর্চা হয়। কীভাবে সবচেয়ে মেধাবী, দক্ষ, সৎ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শিক্ষিতজনকে দিয়ে দেশ গড়ে তুলতে হয়। প্রধানমন্ত্রীরও যেন সব সময়ের জন্য জানা থাকে—একটি সুশৃঙ্খল অরাজনৈতিক প্রশাসনের নিয়মসিদ্ধ কার্যক্রমের বেলায় তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবের কানাকড়ি দামও থাকবে না।
‘ফ্রম থার্ড ওয়ার্লড টু ফার্স্ট’ আত্মজীবনীটি ছাড়াও তাঁর নির্বাচিত সাক্ষাৎকারগুলোর সংকলন রয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে তাঁর একটি উক্তি আছে যার বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘একবার যদি আপনি সিভিল সার্ভিসে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্যকে মানদণ্ড হিসেবে অনুমোদন করেন, তাহলে আপনি রাষ্ট্রকেই ধ্বংসের পথে ঠেলে দেবেন।’ ১৯৭০ সালে সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘সরকার আসবে ও যাবে। সিভিল সার্ভিসকে অবশ্যই সৎ, দক্ষ ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকতে হবে।’ তিনি লিখেছিলেন, ‘যদি আপনি যোগ্যতার পরিবর্তে আনুগত্য দেখে লোক নিয়োগ দেন, তবে পুরো ব্যবস্থাটি পচে যাবে।’
লি কুয়ান থেকে শিক্ষণীয় তৃতীয় শক্তিশালী নীতিমালা, ‘একটি দেশ পারিবারিক ব্যবসা নয়।’ রাষ্ট্রে পরিবার ঢোকানো যাবে না। তাহলে সেটি হয়ে পড়বে প্যাট্রিমোনিয়াল স্টেট, শেষ বেলায় স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বলেছিলেন, ‘যদি আমার ছেলে অযোগ্য হয়, তবে তাকে অন্য যে কারো মতোই পদচ্যুত করতে হবে। আরেকবার বলেছিলেন, ‘যে মুহূর্তে আপনার পরিবার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে, সেই মুহূর্তেই রাষ্ট্র শেষ হয়ে যাবে।’