ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
শীতকাল মানেই কুয়াশা, ঠাণ্ডা বাতাস, কম সূর্যালোক এবং দৈনন্দিন জীবনে একধরনের স্থবিরতা। এই ঋতু আমাদের পরিবেশের পাশাপাশি শরীরের ভেতরেও নানাবিধ পরিবর্তন ঘটায়। বিশেষ করে কোমর, পিঠ ও মেরুদণ্ডের ওপর শীতকালের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে। শীতকালে কোমর ব্যথা এমন একটি সমস্যা, যা হালকা অস্বস্তি থেকে শুরু করে দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণায় রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় শীতকালে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চলাফেরা কমে যায়, পেশী শক্ত হয়ে পড়ে এবং রক্তসঞ্চালনের গতি কমে আসে। এর ফলে যারা আগে থেকেই কোমর ব্যথা, ডিস্ক সমস্যা বা বাতের রোগে ভুগছেন, তাদের কষ্ট বেড়ে যায়। আবার অনেক সুস্থ মানুষও এই সময়ে নতুন করে কোমর ব্যথায় আক্রান্ত হন।
নারী, পুরুষ ও শিশু—সবার ক্ষেত্রেই শীতকালীন কোমর ব্যথার ধরন ও কারণ ভিন্ন। তাই এই সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা এবং সময়মতো প্রতিকার গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
কারণসমূহ
পেশীর সংকোচন ও জড়তা:- ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় শরীর নিজেকে উষ্ণ রাখতে পেশী সংকুচিত করে। এই সংকোচন দীর্ঘ সময় স্থায়ী হলে কোমরের পেশী শক্ত হয়ে যায়। ফলে হঠাৎ নড়াচড়া, ঝুঁকে কাজ করা বা ভার তোলার সময় তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়।
রক্তসঞ্চালন কমে যাওয়া:- শীতে শরীরের রক্তনালিগুলো সংকুচিত হয়। এতে কোমরের পেশী ও হাড়ে পর্যাপ্ত রক্ত ও পুষ্টি পৌঁছায় না। দীর্ঘদিন এমন অবস্থা চলতে থাকলে ব্যথা বাড়ে এবং আরোগ্য হতে সময় লাগে।
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অলসতা:- শীতকালে মানুষ বাইরে কম যায়, হাঁটাচলা কমে যায়। দীর্ঘ সময় বসে থাকা বা শুয়ে থাকার ফলে কোমরের পেশী দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ব্যথার ঝুঁকি বাড়ে।
আর্দ্রতা ও কুয়াশার প্রভাব :- কুয়াশা ও আর্দ্র আবহাওয়া হাড় ও জোড়ার ভেতরের তরলের উপর প্রভাব ফেলে। যাদের বাত, আর্থ্রাইটিস বা ডিস্ক সমস্যা রয়েছে, তাদের ব্যথা শীতে কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে।
মানসিক চাপ ও বিষণ্নতা:- শীতে সূর্যের আলো কম পাওয়া, দীর্ঘ রাত ও একঘেয়েমির কারণে মানসিক চাপ বাড়ে। মানসিক চাপ সরাসরি স্নায়ু ও পেশীর ওপর প্রভাব ফেলে, ফলে ব্যথা আরও তীব্র হয়।
নারীদের ক্ষেত্রে শীতকালীন কোমর ব্যথার কারণ
নারীদের শরীরে হরমোনজনিত পরিবর্তন এবং দৈহিক গঠনের কারণে শীতে কোমর ব্যথার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
* গর্ভাবস্থাজনিত চাপ:- গর্ভাবস্থায় শরীরের ওজন ও ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়। কোমরের পেশী ও মেরুদণ্ডে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। শীতকালে পেশী সংকুচিত হওয়ায় ব্যথা বেড়ে যায়।
* মাসিক চক্রের সময় ব্যথা:- শীতে রক্তসঞ্চালন ধীর হওয়ায় মাসিকের সময় তলপেট ও কোমরের ব্যথা তীব্র হতে পারে।
* হরমোনের ওঠানামা:- হরমোনের পরিবর্তনের ফলে পেশীর নমনীয়তা কমে যায়, যা শীতকালে ব্যথার একটি বড় কারণ।
নারীদের জন্য করণীয়
* কোমর ও তলপেট সবসময় উষ্ণ রাখা
* হালকা যোগব্যায়াম ও প্রসারণ
* গরম পানির ব্যাগ দিয়ে সেঁক
* ক্যালসিয়াম, প্রোটিন ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ
পুরুষদের ক্ষেত্রে শীতকালীন কোমর ব্যথা
* দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা:-অফিসে দীর্ঘক্ষণ চেয়ার ধরে বসে থাকা কোমরের পেশীতে চাপ সৃষ্টি করে।
* শীতে এই চাপ আরও তীব্র হয়:- ভারী শারীরিক শ্রম,কৃষিকাজ, নির্মাণকাজ বা ভারী মাল তোলার সময় কোমরে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা শীতকালে ব্যথায় রূপ নেয়।
* বয়সজনিত পরিবর্তন:- বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড় ও ডিস্ক দুর্বল হয়। শীতে রক্ত চলাচল কমে গেলে ব্যথা বেড়ে যায়।
পুরুষদের জন্য করণীয়
* নিয়মিত হাঁটা ও হালকা ব্যায়াম
* উষ্ণ পোশাক পরিধান
* প্রয়োজনে কোমর সাপোর্ট ব্যবহার
শিশুদের ক্ষেত্রে শীতকালীন কোমর ব্যথা
* ভুল বসার অভ্যাস:- দীর্ঘ সময় পড়াশোনা, টিভি বা মোবাইল ব্যবহারের ফলে কোমরের পেশী দুর্বল হয়।
* অপর্যাপ্ত গরম পোশাক:- শীতে পর্যাপ্ত গরম জামা না পরলে পেশী সংকুচিত হয়ে ব্যথা তৈরি করতে পারে।
* খেলাধুলায় আঘাত:- হঠাৎ পড়ে যাওয়া বা অতিরিক্ত খেলাধুলার সময় কোমরে আঘাত লাগতে পারে।
শিশুদের জন্য করণীয়
* পর্যাপ্ত গরম পোশাক নিশ্চিত করা
* দীর্ঘ সময় বসা এড়িয়ে চলা
* খেলাধুলার আগে হালকা স্ট্রেচিং
* ব্যথা স্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ
শীতকালে কোমর ব্যথা কমাতে কার্যকর ঘরোয়া সমাধান
* গরম সেঁক:- দিনে দুই থেকে তিনবার গরম পানির ব্যাগ দিয়ে কোমরে সেঁক দিলে পেশী শিথিল হয় এবং ব্যথা কমে।
* তেল মালিশ:- সরিষার তেল বা অলিভ অয়েল হালকা গরম করে কোমরে মালিশ করলে রক্তসঞ্চালন বাড়ে।
* হালকা ব্যায়াম ও যোগচর্চা:- প্রতিদিন ১৫–২০ মিনিট হালকা ব্যায়াম কোমরের শক্তি ও নমনীয়তা বজায় রাখে।
* গরম পানীয় গ্রহণ:- আদা চা, গরম দুধ বা স্যুপ শরীরকে ভেতর থেকে উষ্ণ রাখে।
* সঠিক ঘুমের ভঙ্গি:- মাঝারি শক্ত বিছানা ও সঠিক ভঙ্গিতে ঘুমানো কোমরের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
হোমিওসমাধান
শীতকালে কোমর ব্যথার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক রোগীর লক্ষণ অনুযায়ী রাস টক্স, আর্নিকা মন্টেনা, ব্রায়োনিয়া এল্ব, ক্যালক্যারিয়া কার্বনিকা, কালমিয়া, কলস্থিন, রোডোডেনড্রন, কস্টিকাম, ম্যাগনেসিয়া ফসফোরিকা ও হাইপেরিকাম ব্যবহার করে থাকেন।
সতর্কতা: এসব ঔষধ নিজে নিজে ব্যবহার করা নিরাপদ নয়।
পরিশেষে বলতে চাই, শীতকাল কোমর ও মেরুদণ্ডের জন্য একটি সংবেদনশীল সময়। নারীদের ক্ষেত্রে হরমোন ও গর্ভাবস্থা, পুরুষদের ক্ষেত্রে শারীরিক শ্রম ও দীর্ঘ সময় বসা, আর শিশুদের ক্ষেত্রে ভুল অভ্যাস ও আঘাত—সব মিলিয়ে কোমর ব্যথার ঝুঁকি বাড়ে। তবে সচেতনতা, নিয়মিত ব্যায়াম, ঘরোয়া যত্ন, উষ্ণ পরিবেশে থাকা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা গ্রহণ করলে শীতকালেও কোমর ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।শীতকে শুধু কষ্টের সময় না ভেবে, এটি শরীরের যত্ন নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো উচিত।
লেখক: কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান: জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
ন্যাশনাল হোমিও রিসার্চ সেন্টার
অলংকার শপিং কমপ্লেক্স চট্টগ্রাম
এ জাতীয় আরো খবর..