বিশেষ প্রতিনিধি
মোঃ অলিউদ্দিন মিলন
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে গত ২৫শে ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার এই প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনৈতিক সমীকরণকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজপথের দলগুলো এখন চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও জোট গঠনের লড়াইয়ে ব্যস্ত।
১. মাঠ পর্যায়ের রাজনৈতিক চিত্র: তারেক রহমানের প্রভাব
তারেক রহমানের আগমনে বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। তাকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারা দেশে বড় ধরনের শো-ডাউন করছে দলটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের সরাসরি উপস্থিতি বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণাকে কয়েক গুণ শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও এক ধরনের মেরুকরণ তৈরি হয়েছে।
২. জোট গঠনের বর্তমান সমীকরণ
নির্বাচনকে সামনে রেখে বড় বড় দলগুলো সমমনা দলগুলোকে নিয়ে শক্তিশালী মোর্চা গঠন করছে। বর্তমান চিত্র অনুযায়ী:
বিএনপি ও সমমনা জোট: বিএনপি মূলত তাদের দীর্ঘদিনের 'যুগপৎ আন্দোলনের' সঙ্গীদের নিয়েই এগোচ্ছে। তবে এবার আসন ভাগাভাগির ক্ষেত্রে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে পারে দলটি।
জামায়াত-এনসিপি জোট: গত ২৮শে ডিসেম্বর এক চমকপ্রদ ঘোষণায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের দ্বারা গঠিত 'জাতীয় নাগরিক পার্টি' (NCP) নির্বাচনী ঐক্য বা আসন সমঝোতার ঘোষণা দিয়েছে। জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান ৩০০ আসনেই প্রার্থিতার কথা বললেও এই নতুন জোটের মাধ্যমে তারা একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে চায়।
বামেদের অবস্থান: বাম গণতান্ত্রিক জোট এবং অন্যান্য ছোট দলগুলো আলাদাভাবে বা তৃতীয় কোনো ফ্রন্ট গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগ: গত ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।
৩. নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও প্রস্তুতি
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন গত ১১ই ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছেন। কমিশনের বর্তমান অবস্থান ও পদক্ষেপগুলো হলো:
ভোটের তারিখ: ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার দেশের ৩০০ আসনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
একই দিনে গণভোট: নির্বাচনের দিনই 'জুলাই জাতীয় সনদ' বা সংবিধান সংস্কারের ওপর একটি বিশেষ গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
ভোটার তালিকা: সর্বশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এবারই প্রথম প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেতে পারেন।
স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ: কমিশন থেকে জানানো হয়েছে, এবার কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না এবং একটি অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে তারা বদ্ধপরিকর।
৪. চ্যালেঞ্জ ও অনিশ্চয়তা
তারেক রহমানের ফিরে আসা এবং বড় দলগুলোর জোট গঠন নির্বাচনী আমেজ তৈরি করলেও মাঠ পর্যায়ে এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সব দলের জন্য সমান সুযোগ (Level Playing Field) বজায় রাখা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় পরীক্ষা।
সারসংক্ষেপ: তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বিএনপিকে ফ্রন্টফুটে নিয়ে এসেছে, অন্যদিকে জামায়াত ও ছাত্রনেতাদের নতুন জোট রাজনৈতিক সমীকরণে বৈচিত্র্য এনেছে। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি কেবল সরকার গঠনের নির্বাচন নয়, বরং বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর ভাগ্য নির্ধারণী দিন হতে যাচ্ছে।
এ জাতীয় আরো খবর..