সাব্বির আহমেদ,স্টাফ রিপোর্টার
আসন্ন ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এক ঐতিহাসিক গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মাদারীপুর জেলার ৩টি সংসদীয় আসনে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন এখন মিছিল, জনসভা আর তীব্র প্রতিদ্বন্দিতায় মুখরিত। জেলার ১১ লক্ষ ৪৮ হাজার ৩৭৪ জন ভোটারের রায় পেতে প্রার্থীরা চষে বেড়াচ্ছেন মাঠ-ঘাট।
মাদারীপুর-১ (শিবচর): বহুমুখী লড়াই ও বিদ্রোহের সুর
শিবচর উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত মাদারীপুর-১ আসনে এখন সাজ সাজ রব। এখানে মোট ভোটার ৩ লক্ষ ২৪ হাজার ২৯৬ জন। মাদারীপুর জেলা বিএনপির সদস্য ও শিবচর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নাদিরা আক্তারকে বিএনপির মনোনয়ন দেওয়া হয়। মনোনয়ন বঞ্চিত কামাল জামান মোল্লা জাহাজ প্রতিকে ও সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী ফুটবল প্রতিকে স্বতন্ত্র ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকায় বিএনপির ধানের শীষ এখানে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে, এই আসনে ইসলামপন্থী দলগুলোর শক্তিশালী অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা আকরাম হুসাইনসহ অন্যান্যরা ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন। প্রার্থীরা মিছিল, মিটিং, জনসভাসহ সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে যে প্রচারণা চালাচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শিবচরের ১০২ টি কেন্দ্রে জয়ী হতে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজের পাশাপাশি স্থানীয় উন্নয়ন ভাবনা বড় ভূমিকা রাখবে।
মাদারীপুর-২ (সদর ও রাজৈর):
জেলার সবচেয়ে বেশি ভোটার (৪ লক্ষ ৩৬ হাজার ২৭১ জন) সম্বলিত মাদারীপুর-২ আসনটি বরাবরই রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব জাহান্দার আলী জাহান-এর সমর্থনে মাদারীপুর ও রাজৈরের বিভিন্ন রাজপথে বিশাল মিছিলগুলো জেলা শহরকে প্রকম্পিত করছে। ধানের শীষের নির্বাচনী প্রচারণার বিপরীতে ১০ দলীয় জোটের মনোনীত এমপি প্রার্থী মুফতি আব্দুস সোবাহান খান রিকশা প্রতিকে এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আলী আহমাদ চৌধুরী মিছিলসহ তৃণমূল পর্যায়ে বৈঠক ও গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এই আসনে ১৪৫ টি ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় প্রশাসন বিশেষ জোর দিচ্ছে। মাদারীপুর -২ আসনের সচেতন ভোটাররা নির্বাচনে এবার স্থানীয় এলাকার উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানকে প্রধান নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে দেখছেন।
মাদারীপুর-৩ (কালকিনি ও ডাসার):
কালকিনি ও নবগঠিত ডাসার উপজেলার ৩ লক্ষ ৮৭ হাজার ৮০৭ জন ভোটার নিয়ে গঠিত এই আসনে ১৩৪টি ভোটকেন্দ্রে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় নেতা আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন। ঝাউদি ইউনিয়নসহ বিভিন্ন স্থানে তার জনসভাগুলো বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। তবে অপরদিকে বিভিন্ন জনসভা, মিছিল মিটিংসহ মাঠে তীব্র প্রতিদ্বন্দীতা গড়ে তুলেছেন ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. রফিকুল ইসলাম মৃধা দাঁড়িপাল্লা প্রতিকে এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা এস এম আজিজুল হক হাতপাখা প্রতিকে । এ আসনে প্রার্থীরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে নির্বাচনী জনসভা, পরামর্শমূলক সভা, পথসভা, উঠান বৈঠক এবং মাইকিং করে যাচ্ছেন।
নতুন উপজেলা হিসেবে ডাসারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন আর কালকিনি অঞ্চলের কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতির সমস্যার সমাধানই এখানে প্রধান নির্বাচনী ইস্যু।
গণভোট ও জনগণের প্রত্যাশা
সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি এবার ভোটারদের হাতে থাকছে রাষ্ট্র সংস্কারের ‘হ্যাঁ/না’ ভোট দেওয়ার সুযোগ। ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে এই গণভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল আগ্রহ দেখা গেছে। মাদারীপুরের বিভিন্ন গ্রামে তথ্য অফিসের উদ্যোগে আয়োজিত ‘উঠান বৈঠক’ ,সড়ক প্রচার এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ‘ইমাম সম্মেলনে’ গণভোটের গুরুত্ব নিয়ে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা হচ্ছে। ভোটাররা মনে করছেন, এই গণভোটের মাধ্যমেই দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত হবে।
সার্বিকভাবে, মাদারীপুরের ৩টি আসনে ১১ লক্ষাধিক ভোটারের রায় একদিকে যেমন বিএনপিসহ ১০ দলীয় জোটের জামায়াত ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রত্যাশার অগ্নিপরীক্ষা ও ভোটব্যাংক সংহত করারও বড় সুযোগ। ১২ ফেব্রুয়ারির এই মাহেন্দ্রক্ষণ মাদারীপুর তথা গোটা বাংলাদেশের জন্য এক নতুন গণতান্ত্রিক সূর্যোদয়ের বার্তা বয়ে আনবে বলে স্থানীয় ভোটাররা আশা করছেন।