মোঃ অলি উদ্দিন মিলন, বিশেষ প্রতিনিধি:
বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রবেশদ্বার হিসেবে বঙ্গোপসাগর এখন আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশের নানামুখী তৎপরতার মধ্যে এবার এই অঞ্চলে নিজেদের কৌশলগত উপস্থিতি ও কার্যক্রম বাড়াতে যাচ্ছে নেদারল্যান্ডস।
বঙ্গোপসাগর কেবল একটি সমুদ্রাঞ্চল নয়; এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান রুটগুলোর একটি। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের সঙ্গে এশিয়ার যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই জলপথের ভূমিকা অপরিসীম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্র অর্থনীতি, বিশাল মৎস্যসম্পদ, জ্বালানি এবং মুক্ত ও অবাধ নৌ চলাচলের স্বাধীনতার কারণে এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে।
ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত কাঠামোর প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগর এখন বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।
নেদারল্যান্ডস বা ডাচরা ঐতিহাসিকভাবেই সমুদ্র ব্যবস্থাপনা, ড্রেজিং, বন্দর নির্মাণ এবং জলবায়ু সহনশীলতা বা ডেল্টা ম্যানেজমেন্টে বিশ্বজুড়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগরে ডাচদের এই নতুন পদচারণা কেবল সাধারণ বাণিজ্যিক কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে গভীর কৌশলগত কারণ:
বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদি ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নে নেদারল্যান্ডসের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ ও নদীশাসন প্রযুক্তিতে তাদের উপস্থিতি বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে এখানে।
দক্ষিণ এশিয়ার সাপ্লাই চেইন এবং মেরিটাইম হাবগুলোতে নিজেদের প্রভাব ও অংশীদারিত্ব বাড়াতে ডাচ মেরিটাইম কোম্পানিগুলো সবসময় আগ্রহী।
সমুদ্র তীরবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে নৌ-নিরাপত্তা, সুনীল অর্থনীতি এবং সামুদ্রিক বাণিজ্য সুরক্ষায় যৌথ অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে তারা।
ডাচদের এই সম্ভাব্য উপস্থিতি আগামী দিনে আঞ্চলিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। ইউরোপীয় দেশের এই জোরালো পদচারণা বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে একক কোনো দেশের একাধিপত্য কমিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন অনেক কূটনৈতিক বিশ্লেষক।
পাশাপাশি, এটি বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তর, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। তবে একই সাথে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার এই নতুন মাঠে ছোট ও মাঝারি দেশগুলোকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে নিজেদের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
সবমিলিয়ে, ডাচদের এই আগমন বঙ্গোপসাগরের শান্ত জলে নতুন কোনো অর্থনৈতিক বা কৌশলগত ঢেউ তোলে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। সংশ্লিষ্ট মহল ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে এই অঞ্চলের পরিবর্তিত পরিস্থিতির দিকে।
এ জাতীয় আরো খবর..