মোঃ অলিউদ্দিন মিলন, বিশেষ প্রতিনিধি:
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে একক ও নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখা মার্কিন ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এর পাশাপাশি ডলারের বিকল্প হিসেবে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রার উত্থান বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিবিদ ও বিনিয়োগকারীদের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে আর্থিক খাতের বিভিন্ন ফোরামে তুমুল আলোচনা চলছে তবে কি প্রথাগত ফিয়্যাট কারেন্সি বা কাগজের মুদ্রার দিন ফুরিয়ে আসছে এবং বিটকয়েনের মতো ডিজিটাল সম্পদগুলোই হতে যাচ্ছে আগামী দিনের বৈশ্বিক মুদ্রাব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি?
অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি, ডলারের ওপর অতিমাত্রার নির্ভরতা এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সংকোচনমূলক ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন মুদ্রানীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রথাগত মুদ্রার ওপর আস্থা কমছে। ঠিক এই সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে ব্লকচেইন প্রযুক্তিভিত্তিক বিকেন্দ্রীকৃত মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সি। বিশ্লেষকদের মতে, যেখানে একসময় সেন্ট্রাল ব্যাংকগুলোর একক নিয়ন্ত্রণাধীন কাগজের মুদ্রার একচ্ছত্র রাজত্ব ছিল, আজ সেখানে ডিজিটাল ও সীমানা-হীন সম্পদগুলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি বদলে দিতে শুরু করেছে।
বিটকয়েনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর পূর্বনির্ধারিত ও সীমিত সরবরাহ যার মোট পরিমাণ মাত্র ২১ মিলিয়ন বা ২ কোটি ১০ লাখ কয়েন। এই স্বল্প সরবরাহের কারণেই সময়ের সাথে এর মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং এমনকি বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও পোর্টফোলিও বৈচিত্র্য আনতে বিটকয়েনে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
প্রযুক্তিপ্রেমী ও ক্রিপ্টো-সমর্থকদের জোরালো দাবি, ভবিষ্যতের ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেমে একটি মাত্র বিটকয়েনের মালিকানাও একজন সাধারণ মানুষকে বিশ্বমঞ্চে ধনী বা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
তবে এই আশাবাদী চিত্রের পাশাপাশি মুদ্রার অপর পিঠে রয়েছে বড় ধরনের শঙ্কা। অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলছেন, ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং তীব্র মূল্য পরিবর্তনশীলতার (Volatility) শিকার।
সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ প্ল্যাটফর্মে সাইবার হামলা, হ্যাকিং এবং ডিজিটাল সম্পদ চুরির বড় বড় ঘটনা এই খাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। যেহেতু ক্রিপ্টোকারেন্সি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় না, তাই এই বাজারে বিনিয়োগে যেমন রাতারাতি ধনী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি একটু ভুল পদক্ষেপে সর্বস্বান্ত হওয়ার ঝুঁকিও সমপরিমাণে বিদ্যমান।
ডলারের একাধিপত্য খর্ব করে ক্রিপ্টোকারেন্সির জয়জয়কার শুরু হওয়ার কথা বলা হলেও, বিশ্বজুড়ে আইনি স্বীকৃতি এবং কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর (Regulatory Framework) অনুপস্থিতি এর প্রসারের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান অন্তরায়। তা সত্ত্বেও, বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ডিজিটাল মুদ্রার ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রভাবশালী অর্থনীতির দেশগুলো এখন ক্রিপ্টো খাতকে নিয়মের আওতায় আনার জন্য বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। এসব নীতিমালার অন্তর্ভুক্তি এবং এর ক্রমাগত ওঠানামা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আগামী দিনের বৈশ্বিক অর্থনীতি এক ঐতিহাসিক রূপান্তরের দিকে এগোচ্ছে। প্রথাগত ডলার ও উদীয়মান ক্রিপ্টোকারেন্সির এই দ্বৈরথ শেষ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে কোন ভারসাম্য নিয়ে আসে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এ জাতীয় আরো খবর..