লূৎফা সরকার নিশু, স্টাফ রিপোর্টার:
ময়মনসিংহের ত্রিশালে মৃত্যুর আট বছর পর আদালতের নির্দেশে কবর থেকে এক প্রবাসীর স্ত্রীর মরদেহ উত্তোলন করা হয়েছে। পারিবারিক সূত্র জানায়, 'প্রবাসির স্ত্রী অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যু বরণ করেন'। স্ত্রীর মৃত্যুর পাঁচ বছর পর তার স্বামী হত্যা মামলা দায়ের করেন। একাধিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের আলামত না পাওয়ায় ডিবি পুলিশ মরদেহের পুনঃময়নাতদন্তের আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। মৃত্যুর আট বছর পর বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) সকালে কবর থেকে সুলতানা রাজিয়া ওরফে মুক্তা বেগম (৫০) নামের ওই নারীর মরদেহ উত্তোলন করা হয়। ঘটানাটি ঘটেছে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাগান গ্রামে। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাগান গ্রামের আব্দুর রহমানের বড় ছেলে আনিছুর রহমান বাবলুর সঙ্গে তার প্রথম স্ত্রীর বনিবনা না হওয়ায় দ্বিতীয়বারেরমতো বিয়ে করেন সুলতানা রাজিয়া ওরফে মুক্তা বেগম কে। বাবলুর সঙ্গে মুক্তারও সম্পর্ক খুব বেশি ভালো যাচ্ছিল না। ধৈর্যধারন করতে করতে গর্ভে সন্তান আসে। এর পরপরই ১৯৯৬ সালে অবৈধ পথে স্পেনে পাড়ি জমান বাবলু। বিদেশ গিয়ে ঠিকমতো মুক্তার কোন খোঁজখবরও রাখতো না, খরচও দিতো না পরিবারের লোকজন গণমাধ্যম কে বলেন। ২৫/২৬ বছরের মধ্যে ঠিকমতো টাকা পাঠাতো না বলে সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ মিটতো না। হটাৎ একসময় রক্ত স্বল্পতা, হাইপ্রেসার ও কিডনী রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন মুক্তা। কিন্তু টাকার অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসাও করতে না পারায়। মুক্তার শারিরীক অবস্থা খুব বেশি খারাপ হওয়ায় ২০১৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সিবিএমসিবি হাসপাতালে ভর্তি করা হলে পাঁচ দিন পর (১ মার্চ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন ৫০ বছর বয়সি ওই নারী। তারপর ২০২০ সালে দেশে ফিরেন বাবলু। এসময় কুমিল্লার বরড়া থানায় হালিমা নামে এক নারীকে ২০ লাখ টাকা কাবিন দিয়ে বিয়ে করেন। এক বছরও টিকেনি সেই বিয়ে। কাবিনের টাকা ফেরত দিতে দুই ভাইয়ের যৌথ জমি বিক্রি করে পরিশোধ করতে হয়। বাবলু বিদেশ থেকে ছোটভাই মোশফিকুর রহমান মানিকের কাছে পাঠানো টাকা ও ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে তুমুল ঝগড়া বাঁধে। স্ত্রী মুক্তার মৃত্যুর পর বাবলু ২/৩ বার স্পেন থেকে দেশে আসলেও স্ত্রীর মৃত্যু নিয়ে কোন কথা উঠেনি। ব্যবসা সংক্রান্ত কারণে দুই ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে, স্ত্রীর মৃত্যুর পাঁচ বছর পর ২০২৩ সালে বাবলু দেশে ফিরে ত্রিশাল থানায় স্ত্রী হত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। এতে প্রধান আসামি করা হয় ছোট ভাই মানিককে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন তৎকালীন ত্রিশাল থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক মতিউর রহমান। তিনি একটি ভুয়া মেডিকেল সনদ ব্যবহার করে মানিককে হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িয়ে আদালতে চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। বিজ্ঞ আদালত পুণঃ তদন্তের জন্য মামলার দায়িত্বভার দেন সিএইডির কাছে। সিআইডির তদন্তে মেডিকেল সনদটি জাল হিসেবে প্রমাণিত হয় এবং আদালতে তা দাখিল করা হয়। সিআইডির তদন্তে নাখোশ হয়ে বাদী নারাজী দেয়। পরে আদালত মামলাটি ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। ডিবি পুলিশ অধিকতর তদন্তের নিমিত্তে কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করে ডিএনএ পরীক্ষা করার অনুমতির জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেন। আদালত তা মঞ্জুর করলে বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) সকালে কবর থেকে ওই নারীর মরদেহ উত্তোলন করা হয়। এসময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাজিয়া নূর লিয়া। মামলার বাদী বাবলুর ভাগনী আমেনা জানান, টাকার অভাবে ঠিকমতো যখন মুক্তা মামী চিকিৎসাও করতে পারতো না, তখন মানিক মামা আর্থিক সহযোগিতা করতো। বাদী বিবাদীর চাচাত ভাই কাউছার আহমেদ বলেন, অসুস্থতার কারণে মৃত্যুবরণ করার পর আমি নিজে স্বাক্ষর করে হাসপাতাল থেকে মরদেহ গ্রহণ করি। স্থানীয় শহীদ মিয়া জানান, ভাই ভাইয়ের দ্বন্দে মৃত মানুষকে জড়ানো হচ্ছে, এটা খুবই জগন্য কর্ম। স্থানীয় আকরাম হোসেন বলেন, মুক্তা ভাবি যখন মারা যান, তখন বাবলু ভাই বিদেশ ছিলেন। যদি হত্যাকান্ডের মতো ঘটনা ঘটতো তাহলে তো তার মেয়েই অভিযোগ তুলতো। তার মেয়ে ছাড়াও তো পরিবার-পরিজন, এলাকার চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা কি চুপ থাকতো ? স্ত্রীর মৃত্যুর পাঁচ বছর পর কেন হত্যা মামলা দায়ের করলেন, এমন প্রশ্নে আনিছুর রহমান বাবলু জানান, বিষয়টি বুঝতে আমার সময় লেগেছে, সবকিছু জেনে তারপর মামলা করেছি। তারপর কিভাবে বুঝলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার মেয়ে ও আম্মা বলেছে আমার স্ত্রীকে হত্যা করা হয়েছে।
এ জাতীয় আরো খবর..