জাহিদ হাসান টিপু
শরীয়তপুর জেলা প্রতিনিধি
একসময় যেখানে পা রাখাই ছিল দুরূহ, সেই জায়গাটিই এখন রঙিন হাসিতে ভরা একটি আধুনিক শিশু পার্ক। ভেদরগঞ্জ উপজেলা চত্বরে বহু বছর ধরে জমে থাকা ময়লার স্তুপ, দূর্গন্ধ, নোংরা পানি আর অবহেলায় ভরা পরিত্যক্ত জমি যেন হঠাৎ করেই নতুন জীবন পেয়েছে। যে স্থানে মানুষ হাঁটতেও ভয় পেত, আজ সেটি রূপ নিয়েছে পরিচ্ছন্ন ও দৃষ্টিনন্দন কোরআন চত্বরে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু আব্দুল্লাহ খাঁনের উদ্যোগ, পরিকল্পনা ও সার্বিক নজরদারিতে পুরো এলাকার দৃশ্যপটই পাল্টে গেছে। পার্কটির নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ হয়েছে এবং খুব শিগগিরই এটি সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা চত্বরে একপাশে গড়ে উঠেছিল অবৈধ স্থাপনা, অন্যপাশে জমে থাকত এলাকার সব ধরনের ময়লা-আবর্জনা। পরিবেশ ছিল এতটাই নোংরা যে আশপাশের মানুষ প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়তেন। শিশুদের খেলার জায়গা তো দূরের কথা, পার হয়ে যেতেও নাকে রুমাল চাপা দিতে হতো। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ইউএনও মোহাম্মদ আবু আব্দুল্লাহ খাঁন জায়গাটি পরিদর্শন করেন এবং এটিকে জনবান্ধব একটি স্থানে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেন।
পরবর্তী সময়ে তার নেতৃত্বে বড় পরিসরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়। অবৈধ দখলমুক্ত করার পর জায়গাটিকে আধুনিক পার্ক হিসেবে সাজাতে বৃক্ষরোপণ, বসার স্থান, শিশুদের খেলাধুলার রাইড, হাঁটার পথ এবং অন্যান্য নান্দনিক অবকাঠামো তৈরি করা হয়। পাশাপাশি কোরআন শরিফের আদলে একটি আকর্ষণীয় ভাস্কর্য নির্মাণ করায় এটির নতুন নাম হয়— উপজেলা কোরআন চত্বর। মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে স্থাপন করা হয় বিশেষ নামফলকও।
এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে এই পরিবর্তন আনন্দের জোয়ার বইয়ে দিয়েছে।
ভেদরগঞ্জ কিন্ডারগার্টেন এর অধ্যক্ষ আনিসুর রহমান বলেন, "আমাদের শিক্ষার্থীদের বেড়ে ওঠার জন্য এমন উন্মুক্ত জায়গা খুব প্রয়োজন ছিল। ভাগাড় থেকে এমন একটি সুন্দর পার্কে রূপান্তর সত্যিই অনুকরণীয়। শিক্ষার্থীদের শারীরিক-মানসিক ভারসাম্য রক্ষায় এই পার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ইউএনও স্যারের পরিশ্রম না থাকলে এটা সম্ভবই হতো না।"
স্থানীয় চা বিক্রেতা তাইজুল ইসলাম বলেন, “গন্ধের জন্য আগে দোকানে মানুষ দাঁড়াত না। এখন সন্ধ্যা হলেই পার্কের আলোতে চারপাশ জমে ওঠে। সবচেয়ে বড় আকর্ষণ—বাংলাদেশে এ ধরনের কোরআনের ভাস্কর্য এই প্রথম দেখলাম।”
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক টিএম গোলাম মোস্তফা বলেন, “এটা শুধু জায়গার পরিবর্তন নয়—মানুষের মনোভাবের বদল। ভাগাড় থেকে পার্কে রূপান্তর সত্যিই বিরল উদাহরণ। এ ধরনের একটি চত্বর আমাদের গর্ব বাড়িয়েছে।”
এম. এ. রেজা ডিগ্রি কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, “আগে এখানে দিয়ে যাওয়াই কঠিন ছিল। আজ এটি তরুণদের অন্যতম পছন্দের মিলনস্থল। ছবি তোলা, আড্ডা—সবকিছুতেই এখন প্রাণ ফিরে এসেছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু আব্দুল্লাহ খাঁন বলেন, “এই জায়গাটিতে প্রথম দিন এসে বুঝেছিলাম, এটি শুধু ভাগাড় নয়—এখানে সম্ভাবনা আছে। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় আমরা সেই সম্ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছি। এই পার্ক প্রমাণ করে—মানুষ চাইলে পরিত্যক্ত একটি জায়গাও সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “ভবিষ্যতেও পরিবেশবান্ধব ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ নিয়ে আমরা কাজ চালিয়ে যাব। পরিবর্তন সবসময়ই সম্ভব—যদি ইচ্ছা, সঠিক পরিকল্পনা ও মানুষের অংশগ্রহণ থাকে। কোরআন চত্বর সেই ইতিবাচক পরিবর্তনের দৃশ্যমান উদাহরণ।”