নিজস্ব প্রতিবেদক, তালতলী (বরগুনা):
বরগুনার তালতলী বাজারে দোকানের সামনে গাড়ি রেখে ব্যবসা পরিচালনাকে কেন্দ্র করে দুই ব্যবসায়ীর মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় মারামারি থামাতে এগিয়ে আসা ব্যক্তিদেরও মামলার আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একপক্ষীয় ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ তারিখ রোববার আনুমানিক দুপুর ১টার দিকে তালতলী বাজারে এ ঘটনার সূত্রপাত হয়। সবজি ব্যবসায়ী রাসেলের দোকানের সামনে শরবত ব্যবসায়ী সিদ্দিক গাড়ি রেখে শরবত বিক্রি করছিলেন। এতে রাসেলের সবজি ব্যবসায় বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছিল এবং তাঁর ব্যবসায়িক ক্ষতি হচ্ছিল বলে অভিযোগ করেন রাসেল।
এ অবস্থায় রাসেল শরবত ব্যবসায়ী সিদ্দিককে দোকানের সামনে থেকে গাড়িটি সরিয়ে নিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু এ নিয়ে দুজনের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুরু হয়। একপর্যায়ে সিদ্দিক উত্তেজিত কণ্ঠে রাসেলকে গাড়ি সরিয়ে দিতে বলেন। রাসেল গাড়িটি সরাতে এগিয়ে গেলে সিদ্দিক ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর ওপর মারধর শুরু করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
গাড়ি সরানোকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ভুক্তভোগীদের; দাড়ি ছেঁড়ার অভিযোগ ঘিরেও তৈরি হয়েছে বিতর্ক
রাসেলের চিৎকার শুনে পাশের কসমেটিকস ব্যবসায়ী আলামিন ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তিনি ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচিত সদস্য। দুই ব্যবসায়ীর মধ্যে চলমান বিরোধ থামিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এ সময় সিদ্দিক আরও উত্তেজিত হয়ে আলামিনের ওপরও হামলা চালান। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে স্থানীয় ব্যবসায়ী মাহবুব, জাতীয় দৈনিক সোনালী কণ্ঠের সাংবাদিক আল-আমিনসহ কয়েকজন সাধারণ মানুষ ঘটনাস্থলে এগিয়ে আসেন। তাঁরা দুই পক্ষকে নিবৃত্ত করে মারামারি থামানোর চেষ্টা করেন এবং উভয় পক্ষকে সরিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন।
তবে ঘটনার এখানেই শেষ হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের দাবি, পরবর্তীতে শরবত ব্যবসায়ী সিদ্দিকের আত্মীয়স্বজন ঘটনাস্থলে এসে কসমেটিকস ব্যবসায়ী আলামিন ও সবজি ব্যবসায়ী রাসেলকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেন। এমনকি আলামিনের দোকানে প্রবেশ করে রাসেলকে মারধর করার অভিযোগও উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একপর্যায়ে দাড়ি ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ সামনে আসে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে, ঘটনার প্রকৃত কারণ ও উভয় পক্ষের বক্তব্য যথাযথভাবে যাচাই না করেই জলিল আহমেদের পরিচালিত একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের দাবি, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য না নিয়ে একপক্ষীয় তথ্য প্রচারের ফলে প্রকৃত ঘটনা আড়ালে থেকে যাচ্ছে এবং সামাজিকভাবে কয়েকজনকে হেয়প্রতিপন্ন করা হচ্ছে।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে তালতলী থানায় পাঁচজনকে আসামি করে একটি এজাহারভুক্ত মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গেছে। মামলায় আসামি করা হয়েছে—১ নম্বর রাসেল, ২ নম্বর আলামিন, ৩ নম্বর আল-আমিন, ৪ নম্বর মাহবুব এবং ৫ নম্বর জসীমকে।
পরদিন ২৬ তারিখ সোমবার আনুমানিক সকাল ১১টার দিকে মামলার ৪ নম্বর আসামি মাহবুবকে আদালতে পাঠানো হয় বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে মাহবুবের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দুই ব্যবসায়ীর মধ্যে গাড়ি সরানো নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে মারামারি শুরু হয়। আমরা কয়েকজন সেখানে গিয়ে মারামারি থামানোর চেষ্টা করেছি। আলামিনসহ আমিও পরিস্থিতি শান্ত করতে এগিয়ে গিয়েছিলাম। অথচ এখন আমাদেরই মামলার আসামি হতে হয়েছে। যারা মারামারি থামাতে এগিয়ে এসেছে, তাদের কেন আসামি করা হলো—এ প্রশ্নের উত্তর আমরা চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘মামলার ৫ নম্বর আসামি জসীম ঘটনাস্থলে উপস্থিতই ছিলেন না বলে আমাদের দাবি। তিনি সেখানে না থাকলে কীভাবে তাঁকে আসামি করা হলো, সেটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি নবী করিম (সা.)-এর সুন্নত দাড়ি ছিঁড়ে ফেলার যে অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে, সেটিরও সঠিক সত্যতা যাচাই করা হোক। ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে মিথ্যা অভিযোগ বা বিভ্রান্তি ছড়ানো কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা প্রকৃত ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, একটি সাধারণ ব্যবসায়িক বিরোধ কীভাবে বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নিল এবং পরবর্তীতে মারামারি থামাতে আসা ব্যক্তিরাও কীভাবে মামলার আসামি হলেন, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, মামলায় কার কী ভূমিকা ছিল, কে সরাসরি মারামারিতে অংশ নিয়েছেন, আর কে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে এসেছেন—এসব বিষয় প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, প্রয়োজনীয় ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা জরুরি।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রচার না করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, তাঁরা কোনো অপরাধীকে আড়াল করতে চান না; বরং প্রকৃত অপরাধীর পরিচয় উদ্ঘাটন এবং নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিই তাঁদের প্রত্যাশা।
এখন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—প্রশাসন নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
এ জাতীয় আরো খবর..